প্রতিবেদক, মোহাম্মদ মোহসীনঃ
১. ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযোদ্ধা, সুশৃঙ্খল সৈনিক এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের রাজনীতিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও বিএনপির উত্থান-বিকাশের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
২. ঐতিহাসিক পটভূমি
পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে প্রায় ২৫ বছর ধরে এই অঞ্চলের নাগরিকরা গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। নিয়মতান্ত্রিক এ লড়াইয়ের বিজয় ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পথে অর্জনের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হঠকারিতা আমাদেরকে ঠেলে দিয়েছিল যুদ্ধের পথে। প্রতিবেশী ভারতের প্রত্যক্ষ সহায়তা নিয়ে সেই যুদ্ধে জয়লাভ করতে হয়েছিল বলে স্বাধীনতার পর আমাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর ভারতীয় আধিপত্যের প্রভাব পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের
আওয়ামী — লীগ সরকার সেই প্রভাব থেকে জনগণের অধিকার ও বাংলাদেশের স্বার্থকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের আগমন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
৩. জিয়াউর র হমানের প্রাথমিক জীবন ও সামরিক ক্যারিয়ার
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি বাংলাভাষী পাকিস্তানি সৈনিক হিসেবে খেমকারান রণাঙ্গনে প্রবল বিক্রমে লড়েছিলেন। স্বদেশ ও শত্রু পক্ষের কাছে তাঁর সেদিনের অবিস্মরণীয় যুদ্ধবিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। আবার ১৯৭১ সালে তিনি এক ঘোর দুঃসময়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে কী করতে হবে এবং জীবনবাজি রেখে সে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা তাঁকে নেতৃত্বের আসনের দিকে সবসময় ঠেলে দিয়েছে।
তিনি স্বাধীনতার ঘোষক ও যোদ্ধা, আবার সুশৃঙ্খল আইন-অনুগত সৈনিক। সিপাহী-জনতার বিপ্লবের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু তিনি।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরের উন্মাতাল রাজপথে তাঁর রাজনৈতিক অভিষেক ঘটে।
৪. ক্ষমতা গ্রহণ ও রাষ্ট্র সংস্কার
আচমকা তাঁর কাঁধে অর্পিত হয় এক বিশৃঙ্খল দেশের শাসনভার। তখন সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ছিল না। উস্কানি ও চক্রান্তে জর্জরিত সশস্ত্র বাহিনীকে তিনি কঠোর পদক্ষেপে সুশৃঙ্খল করেন। দেশে রাজনীতি ছিল না। জিয়া রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটান। রাজনীতিকদের ওপর জারি করা সামরিক শাসন তুলে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কালজয়ী দর্শন উদ্ ভাবন করে তিনি জাতিকে উপহার দেন পরিচয় ও আদর্শের পতাকা। সময়ের দাবি মেটাতে তিনি সৃষ্টি করেন নতুন রাজনৈতিক
ধারা।
৫. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর গঠন
ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ নামে এই নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে চতুর্থসংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে যে শূন্যতার সৃষ্টি করা হয়, তা পূরণের ইতিহাসের দাবি ও দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষায় বিএনপির অভ্যুদয় ঘটে।
বিএনপির ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাতকঠিন গণঐক্য, ব্যাপক জনভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ ও আধিপত্ববাদের বিভীষিকা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি গঠিত হয়েছে। দলের প্রাথমিক কাঠামোতে ১১ সদস্যের স্থায়ী কমিটি, পার্লামেন্টারি বোর্ডও দলীয় ইলেক্টোরাল কলেজ নির্ধারণ করা হয় এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে ৫ জন সহ-সভাপতি, ১ জন সাধারণ সম্পাদক, ১ জন কোষাধ্যক্ষ, ৪ জন সাংগঠনিক সম্পাদক এবং প্রচার, সমাজকল্যাণ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, দপ্তর, যুব, মহিলা, ছাত্র, শ্রম, কৃষি, আন্তর্জাতিক বিষয়ক ও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক পদ রাখা হয়। দলের প্রথম কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানান্তরিত হয় নয়াপল্টনে।
৬. বিএনপির প্রথম সরকার গঠন
১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবিতে দুই দফায় পিছিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রথম সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠুনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে
এবং ৩৯টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ (মালেক) প্রধান বিরোধী দল হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, “বিএনপির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা।
মালয়েশিয়ার ‘ ’ বিজনেস টাইমস লেখে, “অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবনী সমস্যাগুলো প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। নিউইয়র্কটাইমসও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা
এবং স্বনির্ভরতা অর্জন ও উৎপাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট জিয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে।
৭. শাহাদাত
১৯৮১ সালের ২৯ মে প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রাম সফরে গেলে ৩০ মে ভোরে সার্কিট হাউজে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য তাঁকে হত্যা করে। তাঁর শাহাদাতের পরও নানা পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডে জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের ইতিহাস হয়ে উঠেছে অভিন্ন।
৮. ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
ব্যক্তিগত সততা, উন্নয়ন, ঐক্য এ বং সুসম্পর্কের রাজনৈতিক দর্শনের কারণে রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে।
জিয়াউর র হমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন প্রতিষ্ঠা করে জাতিকে একটি স্পষ্ট পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করেছেন, সামরিক বাহিনীকে সুশৃঙ্খল করেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ইতিহাস। এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথ সুগম করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি আজও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে।
৯. উপসংহার
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি শুধু একজন সামরিক নেতা বা রাজনীতিবিদ — ছিলেন না তিনি ছিলেন জাতির একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি সংকটকালে দায়িত্ব নিয়ে দেশকে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আজও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক-বাহক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
রিপোর্টার 















