মোহাম্মদ মোহসীন, সাংবাদিকঃ
দুই বছর আগের সেই ৫ আগস্টের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেন না রিকশাচালক আবদুল করিম। বিকেলে তিনি তাঁর বৃদ্ধ বাবার জন্য ওষুধ কিনতে বের হয়েছিলেন। বাবা তখন একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু রাস্তায় নামতেই তিনি দেখলেন, শহর যেন অন্যরকম। প্রায় অর্ধেক দোকানের শাটার নামানো। রাস্তায় পুলিশ নেই, ট্রাফিক সিগন্যাল অচল। মোড়ে মোড়ে মানুষের জটলা। আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ। সবার মুখে একই খবর—‘প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন।’
এক মুহূর্তের জন্য করিম বুঝতে পারছিলেন না, এখন কী হবে। ওষুধের দোকানও খোলা নেই। চারপাশে আনন্দ, স্বস্তি, বিস্ময় আর শঙ্কা একসঙ্গে মিশে আছে। কেউ বলছেন, ‘একটা জল্লাদ-যুগের অবসান হলো।’ কেউ আবার বলছেন, ‘এখন যদি বিশৃঙ্খলা শুরু হয়?’
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন গভীর অনিশ্চয়তার মুহূর্ত খুব কমই এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত টানা তিন দিন দেশ কার্যত সরকারবিহীন অবস্থায় ছিল। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো টিকে থাকলেও নির্বাহী নেতৃত্বের শূন্যতা, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
৫ আগস্ট: পতনের দিন
জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক জনসমাগম হয়। সরকার উৎখাতের ডাকে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় আসেন। দুপুরের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই মানুষ গণভবনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় বিজয় মিছিল নিয়ে যান। সেই দৃশ্য বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, এএফপিসহ দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারপ্রধানের পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের ওপরও প্রভাব পড়ে। পুলিশের থানা, ফাঁড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। বেশ কিছু থানা ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। অস্ত্র লুট ও কয়েদি পালানোর মতো ঘটনাও ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা শঙ্কায় কর্মবিরতির ডাক দেয় পুলিশ। ফলে অনেক এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার মতো ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডাকাত আতঙ্কে নির্ঘুম রাত পার করেন বাসিন্দারা। বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার অভাবে সাময়িক বন্ধ রাখা হয়।
৬ ও ৭ আগস্ট: রাষ্ট্র ছিল, সরকার ছিল না
অনেকে এই সময়কে ‘সরকারহীন বাংলাদেশ’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও কার্যকর ছিল। তবে নির্বাহী সরকারের নেতৃত্ব না থাকায় মন্ত্রিসভার নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বে একটি স্পষ্ট শূন্যতা তৈরি হয়। এই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে সময়টিকে সরকারবিহীন সময় হিসেবে মনে হয়েছে।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামান ৬ আগস্ট থেকে প্রশাসনের সবাইকে দপ্তরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও পরিস্থিতির কারণে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ৬ আগস্ট থেকে ব্যাংক ও বন্দর কার্যক্রম এবং উৎপাদন শুরু হলেও নিরাপত্তার শঙ্কায় কার্যত বন্ধই ছিল অর্থনীতির চাকা। সেদিন সচিবালয়ে কিছু কর্মকর্তা গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন আতঙ্কের গুজব ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা দৌড়ে বেরিয়ে পড়েন।
৭ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। রয়টার্স লিখেছে, সাদা গ্লাভস, বাঁশি আর হাতের ইশারায় শিক্ষার্থীরা যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। অনেক এলাকায় তরুণরা রাত জেগে পাড়া পাহারা দেন। মসজিদের মাইক দিয়ে পাহারার ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা সরকারি ভবন, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও পাহারা দেন। কেউ রাস্তা পরিষ্কার করেন, কেউ দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে স্লোগান লেখেন, কেউ আবার মানুষকে গুজব ছড়াতে নিষেধ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একদিকে গুজব ছড়ালেও অন্যদিকে রক্তদান, উদ্ধার সহায়তা, নিরাপত্তা ও জরুরি তথ্য আদান-প্রদানের জন্য হাজারো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হন। যেন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশের মানুষ এক হয়েছিলেন।
এরই মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার প্রস্তাব দেন, যা পরে গৃহীত হয়।
৮ আগস্ট: অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ
৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা শপথ নেন। এর মধ্য দিয়ে তিন দিনের রাজনৈতিক শূন্যতার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। বিবিসি লিখেছে, নতুন সরকারের সামনে তখন ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ—আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসন সচল করা, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
ইতিহাসের বিরল অধ্যায়
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, জরুরি অবস্থা ও রাজনৈতিক সংকট এসেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্টের এই তিন দিন ছিল ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রের কাঠামো টিকে থাকলেও রাজনৈতিক নির্বাহী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
এই তিন দিন প্রমাণ করেছে, একটি সরকারের পতন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়। এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, প্রশাসন এবং সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুকে একসঙ্গে নাড়া দেয়। আবার একই সঙ্গে এই সময় দেখিয়েছে, সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আজ দুই বছর পর ফিরে তাকালে বোঝা যায়, আগস্টের সেই তিন দিন শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের ইতিহাস নয়। এটি ভয়, আশা, পতন ও পুনর্গঠনের এক বিরল মানবিক কাহিনি হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে আছে।
সর্বশেষ :
২০২৪ সালের ৫-৮ আগস্ট: বাংলাদেশের তিন দিনের সরকারহীন অনিশ্চয়তা
-
রিপোর্টার - আপডেট টাইম : ১২:২১:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
- ২৩ পঠিত
ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ














