নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা। ১৮ জানুয়ারি ২০২৬,
বয়স ৭৪ বছর, সিনেমা করেছেন চার শতাধিক, তবু প্রতিবারই তাঁকে আবিষ্কার করতে হয় নতুনভাবে। এই বয়সে দক্ষিণি সিনেমার তারকা মামুট্টি করলেন ‘নারী লোভী’ এক ক্রমিক খুনির (সিরিয়াল কিলার) চরিত্র! তা-ও আবার সেই সিনেমার প্রযোজকও তিনি। মামুট্টি ছবির নায়ক নন, খলনায়ক। অভিনয়, অভিব্যক্তি আর নিজের নায়কোচিত উপস্থিতি দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন নতুন অনেকেই আসতে পারেন, কিন্তু মামুট্টি এখনো আছেন আগের মতোই। তাই জিতিনকে জোশের অ্যাকশন থ্রিলার ‘কালামকাভাল: দ্য ভেনম বিনিথ’ হয়ে উঠল উপভোগ্য এক সিনেমা। অভিষিক্ত এই নির্মাতা জিষ্ণু শ্রীকুমারের সঙ্গে সিনেমাটির চিত্রনাট্যও লিখেছেন।
একনজরে
সিনেমা: ‘কালামকাভাল’
ধরন: থ্রিলার
পরিচালনা: জিতিন কে জোসে
অভিনয়: মামুট্টি, ভিনায়াকান
স্ট্রিমিং: সনি লিভ
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিট
ছবির প্রথম ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ মিনিটের একটি অংশ আছে, যাকে অনায়াসেই বলা যায় গত বছরের মালয়ালম সিনেমার সবচেয়ে পরিশীলিত দৃশ্যধারা। একে ঠিক দৃশ্য না মন্তাজ—কোনো সংজ্ঞায় ফেলা কঠিন। এখানে চিত্রনাট্য আর সম্পাদনার মাঝের সীমারেখা এতটাই অদৃশ্য যে সিনেমা কীভাবে কাজ করে—তা যেন চোখের সামনেই ভেঙে নতুন করে গড়ে ওঠে। এই অংশে ধরা পড়ে এক নিষ্ঠুর সিরিয়াল কিলারের কার্যপ্রণালি। তার শিকারদের সংখ্যা এত বেশি যে তা একটি ছোট গ্রামের জনসংখ্যাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।
এই হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রে রয়েছে স্ট্যানলি—মামুট্টির অভিনীত চরিত্র। এক শিকার থেকে আরেক শিকারে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ছদ্মনাম বদলে যায়, গির্জা রূপ নেয় মন্দিরে, আর এক নারীর ট্র্যাজেডি আরেক নারীর গল্পের সঙ্গে অদলবদল হয়ে যায়। সবকিছুই ঘটে একই টাইমলাইনের ভেতর, একই অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ছায়ায়। স্ট্যানলি ভুয়া নম্বর ব্যবহার করে তামিলনাড়ু ও কেরালার অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করেন। এরপর হোটেল বা লজে যৌন সম্পর্ক করেন, এরপরেই সেই নারীকে অভিনব সব উপায়ে খুন করেন।
পরিচালক ছবিটিকে ভাগ করেছেন কয়েকটি অধ্যায়ে—স্ট্যানলি দাসের জীবনের অধ্যায় হিসেবে। পুলিশ কর্মকর্তা নাথ বা জয়কৃষ্ণনের (ভিনায়কান) তদন্ত যত এগোয়, স্ট্যানলির দুঃসাহসও তত বাড়তে থাকে। গল্পের বড় একটি অংশ কেরালা-তামিলনাড়ু সীমান্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠে। দুই রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে শিকার ধরার এই যাত্রায় দুই চরিত্রের দ্বৈত সত্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক মুহূর্তে আমরা দেখি এক গৃহস্থ মানুষকে, পরক্ষণেই তার ভেতর জেগে ওঠে এক নির্মম খুনি। আবার ঠিক পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে পরবর্তী চালের পরিকল্পনা করে।
বাইরে থেকে সে এক সুখী গৃহস্থ, অথচ একই সঙ্গে সে নির্বিচারে পরকীয়ায় জড়ানো এক নির্মম সিরিয়াল কিলার, যে কেবল হত্যার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়। তার এক প্রেমিকা দীপাকে (শ্রুতি রামাচন্দ্রন) শ্বাস রোধ করে হত্যার মুহূর্তে সে বলে, ‘ঝুঁকি যত বেশি, তৃপ্তিও তত বেশি।’ স্ট্যানলি খুনের জন্য বেছে নেয় বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বিয়ের উপযুক্ত বয়সী নারীদের।
‘কালামকাভাল’ শুধু থ্রিলার নয়, এটি একই সঙ্গে একটি চরিত্র-অধ্যয়নও। একদিকে এটি স্ট্যানলি ও তদন্তকারী জয়কৃষ্ণনের (ভিনায়াকান) মধ্যে বুদ্ধির লড়াই, অন্যদিকে দুই প্রায় সমজাতীয় মানসিকতার মানুষের প্রতিচ্ছবি।
সিরিয়াল কিলার ঘরানার বহু পরিচিত কাঠামো ব্যবহার করলেও ‘কালামকাভাল’ আলাদা হয়ে ওঠে দৃশ্য থেকে দৃশ্যে যাওয়ার অনবদ্য সাবলীলতায় আর পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে। একটি ফোনকল থেকে কেমন করে দৃশ্য কেটে আবার সেই ফোনকলেই ফিরে আসা হয়—এমন সূক্ষ্ম সিদ্ধান্তই ছবিটিকে ব্যতিক্রমী করে তোলে। ফরেনসিক কর্মকর্তার কাছ থেকে স্ট্যানলি যখন নতুন এক শিকার ধরার কৌশল জানতে পারে, তখন টাইমলাইন ও চরিত্র বদলের ভেতর দিয়ে দর্শক ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে, এই একটি মুহূর্ত তৈরি করতে কতগুলো সিনেমাটিক উপাদান নিখুঁতভাবে একসঙ্গে কাজ করেছে।
রিপোর্টার 

















