ঢাকা ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরিশালে সরকারি খাস পুকুরে বালু ভরাট, জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের

  • রিপোর্টার
  • আপডেট টাইম : ০৮:১০:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪ পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদকঃ
বরিশাল নগরীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশে সরকারি খাসজমির পুকুরে বালু ফেলে ভরাটের কাজ চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জালিয়াতি করে পুকুরটি ব্যক্তি মালিকানায় দাবি করা হচ্ছে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ভরাট করছেন। তাদের পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুকুরটি ভরাট করছেন শহরের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম লিয়ন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বাবুল তালুকদার, মো. আলমগীর ও রফিকুল ইসলাম। লিয়ন ভাঙাড়ির ব্যবসা করেন এবং এক যুবদল নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একই ওয়ার্ডের মহানগর বিএনপির এক নেতাও তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
লিয়ন বলেন, “ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিক হেলাল আকন ও তাঁর বোন। আমরা চারজন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে বালু ফেলে ভরাট করছি। পরে প্লট আকারে বিক্রির পরিকল্পনা আছে।” তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগকে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেন। ঠিকাদার মো. জুয়েল জানান, সাত লাখ টাকার চুক্তিতে কাজ করছেন।
৬৯ শতাংশের এই পুকুরের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর পাশেই বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু প্রায় ২০ দিন ধরে চলা ভরাটকাজ বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ পুকুর ভরাট হয়ে গেছে।
বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে উত্তরমুখী সড়কে মুন্সীবাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই পুকুরটি মূল সড়ক থেকে দেখা যায় না। প্রবীণ বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, “৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা জানতাম এটি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুর। কয়েক দিন আগে শুনেছি কারা নাকি কিনেছেন।”
হাসপাতালের অফিস সহকারী (ফার্মাসিস্ট) আনোয়ারা বেগম জানান, হাসপাতালের সাত একর ৪১ শতাংশ জমির পর্চা রয়েছে। দাগ নম্বর ১০৬৯ (ভিটা), ১০৭০ ও ১০৭১ (পুকুর)। পর্চায় মালিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টর। তিনি বলেন, “কাউনিয়া থানা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে ঘুরেছি। কিন্তু ভরাট বন্ধ হচ্ছে না।”
চিকিৎসা কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার বলেন, “পুরোনো কর্মচারীরা সবাই জানেন এটি সরকারি জমি। রাতের আঁধারে ভরাট করা হচ্ছে। ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় অভিযোগ দিয়েছি। সিভিল সার্জন, এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসককেও জানানো হয়েছে। এসিল্যান্ড বেড়া দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সোমবার রাতে দখলদাররাই গাছপালা কেটে বেড়া দিয়েছে। পুলিশ এসেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, “এ ঘটনায় বিএনপির কোনো নেতা জড়িত নন। কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি হয়েছে কিনা, তা ভূমি অফিস দেখবে।”
সদর উপজেলার এসিল্যান্ড আজহারুল ইসলাম জানান, পুকুরটি খাস খতিয়ানের জমি। প্রায় ১৫ বছর আগে বিএস রেকর্ডে ব্যক্তি মালিকানা দেখানো হয়। বড় অঙ্কের লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করে চ্যালেঞ্জ করবেন বলে জানান।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, “প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। মামলা করে জমি উদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সরকারি সম্পত্তি বেহাত ঠেকাতে যা করণীয় আমি করব।”
জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
স্থানীয়রা বলছেন, হাসপাতালের পাশে সরকারি জলাশয় দখল ও ভরাটের এই ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

নেত্রকোণায় কুমুদগঞ্জ বাজারে অভিযান: ৯০৫ পিস ইয়াবাসহ ৬৫ বছরের বৃদ্ধ গ্রেফতার

বরিশালে সরকারি খাস পুকুরে বালু ভরাট, জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের

আপডেট টাইম : ০৮:১০:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদকঃ
বরিশাল নগরীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পাশে সরকারি খাসজমির পুকুরে বালু ফেলে ভরাটের কাজ চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জালিয়াতি করে পুকুরটি ব্যক্তি মালিকানায় দাবি করা হচ্ছে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ভরাট করছেন। তাদের পেছনে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুকুরটি ভরাট করছেন শহরের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম লিয়ন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বাবুল তালুকদার, মো. আলমগীর ও রফিকুল ইসলাম। লিয়ন ভাঙাড়ির ব্যবসা করেন এবং এক যুবদল নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একই ওয়ার্ডের মহানগর বিএনপির এক নেতাও তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
লিয়ন বলেন, “ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিক হেলাল আকন ও তাঁর বোন। আমরা চারজন পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে বালু ফেলে ভরাট করছি। পরে প্লট আকারে বিক্রির পরিকল্পনা আছে।” তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগকে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেন। ঠিকাদার মো. জুয়েল জানান, সাত লাখ টাকার চুক্তিতে কাজ করছেন।
৬৯ শতাংশের এই পুকুরের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর পাশেই বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু প্রায় ২০ দিন ধরে চলা ভরাটকাজ বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ পুকুর ভরাট হয়ে গেছে।
বীণাপাণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে উত্তরমুখী সড়কে মুন্সীবাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই পুকুরটি মূল সড়ক থেকে দেখা যায় না। প্রবীণ বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, “৫০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা জানতাম এটি বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুর। কয়েক দিন আগে শুনেছি কারা নাকি কিনেছেন।”
হাসপাতালের অফিস সহকারী (ফার্মাসিস্ট) আনোয়ারা বেগম জানান, হাসপাতালের সাত একর ৪১ শতাংশ জমির পর্চা রয়েছে। দাগ নম্বর ১০৬৯ (ভিটা), ১০৭০ ও ১০৭১ (পুকুর)। পর্চায় মালিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টর। তিনি বলেন, “কাউনিয়া থানা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে ঘুরেছি। কিন্তু ভরাট বন্ধ হচ্ছে না।”
চিকিৎসা কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার বলেন, “পুরোনো কর্মচারীরা সবাই জানেন এটি সরকারি জমি। রাতের আঁধারে ভরাট করা হচ্ছে। ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় অভিযোগ দিয়েছি। সিভিল সার্জন, এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসককেও জানানো হয়েছে। এসিল্যান্ড বেড়া দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সোমবার রাতে দখলদাররাই গাছপালা কেটে বেড়া দিয়েছে। পুলিশ এসেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, “এ ঘটনায় বিএনপির কোনো নেতা জড়িত নন। কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি হয়েছে কিনা, তা ভূমি অফিস দেখবে।”
সদর উপজেলার এসিল্যান্ড আজহারুল ইসলাম জানান, পুকুরটি খাস খতিয়ানের জমি। প্রায় ১৫ বছর আগে বিএস রেকর্ডে ব্যক্তি মালিকানা দেখানো হয়। বড় অঙ্কের লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করে চ্যালেঞ্জ করবেন বলে জানান।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, “প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। মামলা করে জমি উদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। সরকারি সম্পত্তি বেহাত ঠেকাতে যা করণীয় আমি করব।”
জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন না। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
স্থানীয়রা বলছেন, হাসপাতালের পাশে সরকারি জলাশয় দখল ও ভরাটের এই ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।